
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট শেখ জামালের ৭৩ তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৫৪ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম থেকেই তিনি এমন এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন, যেখানে দেশপ্রেম, নেতৃত্ব এবং সংগ্রামের শিক্ষা ছিল জীবনের অংশ।
শেখ জামালের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও উজ্জ্বল। তিনি ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি সংস্কৃতি ও খেলাধুলার প্রতি গভীর অনুরাগ গড়ে তোলেন। সংগীতচর্চার অংশ হিসেবে গিটার শেখার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন এবং একই সঙ্গে ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে তাঁর শৃঙ্খলা ও দলগত নেতৃত্বগুণ ছিল প্রশংসনীয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ জামাল পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা গৃহবন্দি হন। কিন্তু সেখান থেকে সাহসিকতার সঙ্গে পালিয়ে তিনি স্বাধীনতার সংগ্রামে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে ধানমন্ডি থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভারতের আগরতলা পৌঁছান। সেখানে মুজিব বাহিনীতে (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস বিএলএফ) যোগ দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ৯ নম্বর সেক্টরে সম্মুখ সমরে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল এক সাহসী তরুণ যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি।
স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের প্রথম ব্যাচের একজন কমিশন্ড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে যুগোস্লাভিয়ার মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত স্যান্ডহার্স্ট একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগ দেন।
সেনাবাহিনীতে তাঁর কর্মজীবন ছিল সংক্ষিপ্ত হলেও অত্যন্ত প্রভাবশালী। সহকর্মী অফিসার ও সৈনিকদের কাছে তিনি দ্রুতই একজন প্রিয় ও দক্ষ নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। ট্রেনিং গ্রাউন্ড, রণকৌশল শিক্ষা এবং বিভিন্ন শারীরিক অনুশীলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ সৈনিকদের অনুপ্রাণিত করত। তিনি ব্যাটালিয়ন বক্সিং টিমের সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ দিতেন, যা তাঁর বহুমুখী দক্ষতার প্রমাণ বহন করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নির্মম অধ্যায়। এর আগের দিন, ১৪ আগস্ট, তিনি ক্যান্টনমেন্টে ডিউটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ধানমন্ডির বাসভবনে ফিরে আসেন। সেই রাতেই ঘাতকদের নির্মম হামলায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে শেখ জামালও শহীদ হন।
শেখ জামাল ছিলেন একাধারে দেশপ্রেমিক, সংস্কৃতিমনা তরুণ এবং প্রতিশ্রুতিশীল সেনা কর্মকর্তা। তাঁর জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু আদর্শ ও কর্মে ভরপুর। আজ তাঁর জন্মদিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে এই সাহসী ও সম্ভাবনাময় ব্যক্তিত্বকে, যিনি দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।